লাভ-ক্ষতির হিসাব: শতকরা লাভ বের করার নিয়ম, মার্কআপ ও মার্জিন
লাভ বা ক্ষতি আর ক্রয়মূল্যের ওপর শতকরা হার বের করার নিয়ম, একই বিক্রিতে মার্কআপ আর মার্জিন কেন আলাদা, আর ছাড় দিলে লাভ কতটা কমে, উদাহরণসহ।
প্রকাশ: 29 অক্টোবর 2026
সংক্ষেপে উত্তর
লাভ = বিক্রয়মূল্য − ক্রয়মূল্য, আর লাভের শতাংশ = লাভ ÷ ক্রয়মূল্য × 100। ৳80-এ কিনে ৳100-এ বেচলে লাভ ৳20: ক্রয়মূল্যের ওপর 25% (মার্কআপ), কিন্তু বিক্রয়মূল্যের মাত্র 20% (মার্জিন)। ফল ঋণাত্মক হলে তা লোকসান।
লাভ-ক্ষতির মূল সূত্র
যে দামে কিনেছেন তা ক্রয়মূল্য, যে দামে বেচলেন তা বিক্রয়মূল্য। দুটোর পার্থক্যই লাভ বা ক্ষতি:
লাভ বা ক্ষতি = বিক্রয়মূল্য − ক্রয়মূল্য
ফল ধনাত্মক হলে লাভ, ঋণাত্মক হলে ক্ষতি, আর শূন্য হলে সমান সমান (ব্রেক-ইভেন)।
- ৳80-তে কিনে ৳100-তে বিক্রি: লাভ 100 − 80 = ৳20।
- ৳800-এর পণ্য ৳1,000-এ বিক্রি: লাভ ৳200।
- একই ৳800-এর পণ্য ৳600-এ বিক্রি: 600 − 800 = −200, অর্থাৎ ক্ষতি ৳200।
ক্রয়মূল্যে শুধু পণ্যের দাম নয়, ডেলিভারি, প্যাকেজিং বা ভাড়ার মতো যে খরচ ওই পণ্যের পেছনে হয়েছে তা-ও যোগ করুন। নইলে কাগজে লাভ দেখাবে, পকেটে নয়। দুটি দাম দিলে লাভ-ক্ষতি ক্যালকুলেটর টাকায় লাভ বা ক্ষতি, শতাংশ আর মার্জিন একসাথে দেখায়।
শতকরা লাভ বা ক্ষতি বের করার নিয়ম
শতকরা লাভ (বা ক্ষতি) = লাভ (বা ক্ষতি) ÷ ক্রয়মূল্য × 100
স্কুলের লাভ-ক্ষতির অংকে আলাদা করে না বললে শতকরা লাভ-ক্ষতি সবসময় ক্রয়মূল্যের ওপর ধরা হয়। কারণটা সহজ: আপনি যে টাকা খাটিয়েছেন, তার ওপর কত শতাংশ ফিরল, সেটাই প্রশ্ন।
- ক্রয়মূল্য ৳80, বিক্রয়মূল্য ৳100: 20 ÷ 80 × 100 = 25% লাভ।
- ক্রয়মূল্য ৳800, ক্ষতি ৳200: 200 ÷ 800 × 100 = 25% ক্ষতি।
- ক্রয়মূল্য ৳100, বিক্রয়মূল্য ৳80: ক্ষতি ৳20, যা 20% ক্ষতি।
- ৳500-এর জিনিস বিনামূল্যে দিয়ে দিলে ক্ষতি ৳500, অর্থাৎ ক্রয়মূল্যের 100%। ক্ষতি কখনো 100%-এর বেশি হয় না, কিন্তু লাভ 100%-এর বেশি হতেই পারে।
উল্টো অংক: শতকরা লাভ জানা থাকলে
বিক্রয়মূল্য = ক্রয়মূল্য × (1 + লাভ% ÷ 100), আর ক্রয়মূল্য = বিক্রয়মূল্য ÷ (1 + লাভ% ÷ 100)। ক্ষতির বেলায় যোগের জায়গায় বিয়োগ। যেমন ৳800-এর পণ্যে 25% লাভ রাখতে 800 × 1.25 = ৳1,000-এ বেচতে হবে। আবার 20% ক্ষতিতে ৳80-এ বিক্রি হলে ক্রয়মূল্য ছিল 80 ÷ 0.80 = ৳100। এমন উল্টো হিসাব শতকরা ক্যালকুলেটরেও করা যায়।
লাভ ক্ষতির অংক: ধাপে ধাপে দুটি উদাহরণ
1. একসাথে কিনে আলাদা করে বেচা
একজন দোকানদার 12টি কলম ৳150-এ কিনে প্রতিটি ৳15-এ বিক্রি করলেন। শতকরা কত লাভ?
- প্রতিটি কলমের ক্রয়মূল্য = 150 ÷ 12 = ৳12.50।
- প্রতিটিতে লাভ = 15 − 12.50 = ৳2.50।
- শতকরা লাভ = 2.50 ÷ 12.50 × 100 = 20%।
- যাচাই: মোট বিক্রি 12 × 15 = ৳180, মোট লাভ ৳30, আর 30 ÷ 150 × 100 = 20%। মিলে গেছে।
মোট বা প্রতি একক, যেভাবেই হিসাব করুন, শতাংশ একই আসে। শুধু খেয়াল রাখুন দুটো দাম যেন একই এককের হয়: একটি কলমের দামের সাথে ডজনের দাম মেলাবেন না।
2. ক্ষতি থেকে লাভে যেতে কত দামে বেচতে হবে
একটি পণ্য ৳900-এ বিক্রি করে 10% ক্ষতি হলো। 10% লাভ করতে কত দামে বেচতে হতো?
- ৳900 হলো ক্রয়মূল্যের 90%, তাই ক্রয়মূল্য = 900 ÷ 0.90 = ৳1,000।
- 10% লাভে বিক্রয়মূল্য = 1,000 × 1.10 = ৳1,100।
এখানে ৳900-এর সাথে 20% যোগ করে ৳1,080 ধরা ভুল, কারণ দুটি শতাংশই ক্রয়মূল্যের ওপর, ৳900-এর ওপর নয়। আগে ক্রয়মূল্য বের করাই এমন অংকের চাবি।
মার্কআপ বনাম মার্জিন: একই লাভ, দুই শতাংশ
ব্যবসায় দুটি শতাংশ চলে, আর এ দুটো গুলিয়ে ফেলাই সবচেয়ে বড় ভুল:
- মার্কআপ = লাভ ÷ ক্রয়মূল্য × 100। কেনা দামের ওপর কত যোগ করলেন। ওপরের “শতকরা লাভ” আসলে এটাই।
- মার্জিন = লাভ ÷ বিক্রয়মূল্য × 100। বিক্রির টাকার কত অংশ লাভ হিসেবে থাকল।
দুটোরই কাজ আছে। দাম বসাতে মার্কআপ সহজ, কারণ কেনা দামের সাথে সরাসরি শতাংশ যোগ করা যায়। আর মাস শেষে মোট বিক্রির টাকার কত অংশ লাভ হিসেবে থাকল, সেটা বোঝাতে মার্জিন বেশি কাজের। লাভ একই, কিন্তু ভাগ হয় আলাদা দামে, তাই সংখ্যাও আলাদা:
| ক্রয়মূল্য (৳) | বিক্রয়মূল্য (৳) | লাভ (৳) | মার্কআপ | মার্জিন |
|---|---|---|---|---|
| 80 | 100 | 20 | 25% | 20% |
| 800 | 1,000 | 200 | 25% | 20% |
| 12.50 | 15 | 2.50 | 20% | 16.67% |
| 250 | 500 | 250 | 100% | 50% |
| 50 | 200 | 150 | 300% | 75% |
দাম দ্বিগুণ করা মানে 100% মার্কআপ, কিন্তু মাত্র 50% মার্জিন। মার্জিন কখনো 100% ছুঁতে পারে না, কারণ লাভ কখনো বিক্রয়মূল্যের চেয়ে বড় হয় না; মার্কআপের কোনো ঊর্ধ্বসীমা নেই। একটি থেকে আরেকটিতে যেতে:
- মার্জিন = মার্কআপ ÷ (100 + মার্কআপ) × 100। যেমন 25 ÷ 125 × 100 = 20%।
- মার্কআপ = মার্জিন ÷ (100 − মার্জিন) × 100। যেমন 20 ÷ 80 × 100 = 25%।
নির্দিষ্ট মার্জিন রাখতে বিক্রয়মূল্য কত হবে
ব্যবসার পরিকল্পনায় অনেকে লাভের লক্ষ্য ঠিক করেন মার্জিনে, যেমন “বিক্রির টাকার এক-চতুর্থাংশ লাভ থাকবে”। ৳800-এর পণ্যে 25% মার্জিন চাইলে হিসাব 800 × 1.25 নয়:
বিক্রয়মূল্য = ক্রয়মূল্য ÷ (1 − মার্জিন ÷ 100)
800 ÷ 0.75 = ৳1,066.67। মিলিয়ে দেখুন: লাভ ৳266.67, যা ৳1,066.67-এর 25%। আর ৳1,000-এ বেচলে মার্কআপ 25% হলেও মার্জিন মাত্র 20%। কোন শতাংশের কথা হচ্ছে, তা আগে নিশ্চিত হয়ে নিন।
ছাড় দিলে লাভ কতটা কমে
গায়ের দামে ছাড় দিলে লাভ শতাংশের চেয়ে অনেক দ্রুত কমে। ৳800-এর পণ্যের গায়ে ৳1,000 লেখা (25% মার্কআপ):
- 10% ছাড়ে বিক্রি ৳900: লাভ ৳100, ক্রয়মূল্যের 12.5%।
- 20% ছাড়ে বিক্রি ৳800: লাভ শূন্য, একেবারে সমান সমান। 25% মার্কআপ মুছে দিতে 20% ছাড়ই যথেষ্ট।
- 25% ছাড়ে বিক্রি ৳750: লাভ তো নেই-ই, উল্টো ক্ষতি ৳50, যা ক্রয়মূল্যের 6.25%।
ছাড়ের পর দাম কত দাঁড়াবে তা ছাড় ক্যালকুলেটরে দেখে নিন, তারপর সেই দামকে বিক্রয়মূল্য ধরে লাভ মেলান।
লাভ-ক্ষতির হিসাবে সাধারণ ভুল
- শতকরা লাভ বিক্রয়মূল্য দিয়ে ভাগ করা। ৳80 → ৳100-এ লাভ 25%, 20% নয়; 20% হলো মার্জিন।
- ক্ষতির শতাংশও বিক্রয়মূল্যের ওপর ধরা। ৳100 → ৳80-এ ক্ষতি ক্রয়মূল্যের 20%; ৳20 ÷ ৳80 = 25% ধরলে ভুল।
- 25% মার্কআপকে 25% মার্জিন ভাবা। এতে প্রতিটি বিক্রিতে আশার চেয়ে কম থাকে।
- অন্য খরচ বাদ রাখা। ডেলিভারি, প্যাকেজিং, অনলাইন পেমেন্টের চার্জ ক্রয়মূল্যে না ধরলে লাভ বেশি দেখায়।
- ভ্যাটসহ দামকে আয় ধরা। ভ্যাট ছাড়া ৳800-এ কেনা পণ্য ভ্যাটসহ ৳1,150-এ বেচলে আয় ৳1,000, লাভ ৳200, ৳350 নয়।
যেকোনো ক্রয়মূল্য আর বিক্রয়মূল্য দিয়ে লাভ-ক্ষতি ক্যালকুলেটরে হিসাবটা মিলিয়ে নিন: টাকায় লাভ বা ক্ষতি, ক্রয়মূল্যের ওপর শতাংশ আর মার্জিন পয়সা পর্যন্ত দেখা যাবে।