ইএমআই কীভাবে হিসাব হয়: সূত্র ও উদাহরণ
রিডিউসিং-ব্যালান্স পদ্ধতিতে ইএমআইয়ের সূত্র ধাপে ধাপে, প্রতিটি কিস্তিতে সুদ ও আসলের ভাগ, আর একই হারে ফ্ল্যাট রেট কেন বেশি খরচের, একটি পুরো উদাহরণসহ।
প্রকাশ: 28 অক্টোবর 2026
সংক্ষেপে উত্তর
ইএমআই = P × r × (1 + r)ⁿ ÷ ((1 + r)ⁿ − 1), যেখানে r = বার্ষিক সুদ ÷ 12 ÷ 100 আর n = মাসের সংখ্যা। ৳5,00,000 ঋণ 9% সুদে 5 বছরে মাসে ৳10,379, মোট সুদ ৳1,22,751; একই 9% ফ্ল্যাট রেটে হলে মাসে ৳12,083।
ইএমআই কী, আর সূত্রটা কী
ইএমআই (ইকুয়েটেড মান্থলি ইনস্টলমেন্ট) হলো লোন পুরো শোধ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসে দেওয়া একই অঙ্কের কিস্তি। প্রচলিত রিডিউসিং-ব্যালান্স পদ্ধতিতে প্রতি মাসের সুদ ধরা হয় শুধু যত টাকা তখনো বাকি আছে তার ওপর। প্রতিটি কিস্তি থেকে আগে সেই মাসের সুদ যায়, বাকিটা আসল (মূল ঋণ) কমায়।
ইএমআই = P × r × (1 + r)ⁿ ÷ ((1 + r)ⁿ − 1)
- P = লোনের পরিমাণ (আসল)।
- r = মাসিক সুদের হার, ভগ্নাংশে: বাৎসরিক হার ÷ 12 ÷ 100।
- n = মোট মাসিক কিস্তির সংখ্যা (বছর × 12)।
সুদ 0% হলে সূত্রটি সহজ হয়ে দাঁড়ায় ইএমআই = P ÷ n। নিজের লোনের অঙ্ক দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে হিসাব দেখতে ইএমআই / লোন ক্যালকুলেটর ব্যবহার করুন। নিচে একই হিসাব হাতে করে দেখানো হলো।
উদাহরণ: ৳5,00,000 লোন, বছরে 9%, 5 বছর
- মাসিক হার: r = 9 ÷ 12 ÷ 100 = 0.0075, অর্থাৎ মাসে 0.75%।
- কিস্তির সংখ্যা: n = 5 × 12 = 60।
- (1 + r)ⁿ = 1.0075⁶⁰ ≈ 1.565681।
- ইএমআই = 5,00,000 × 0.0075 × 1.565681 ÷ (1.565681 − 1) = 3,750 × 1.565681 ÷ 0.565681 ≈ ৳10,379.18।
- মোট পরিশোধ = 10,379.18 × 60 ≈ ৳6,22,751।
- মোট সুদ = 6,22,751 − 5,00,000 ≈ ৳1,22,751।
অর্থাৎ 5 বছরে আপনি যা দেবেন তার প্রায় 19.7% সুদ। কিস্তি রাউন্ড করলে মাসে ৳10,379 ধরা যায়।
প্রতি কিস্তিতে সুদ আর আসলের ভাগ
প্রতি মাসে আগে বকেয়ার ওপর সুদ হিসাব হয়, তারপর ইএমআইয়ের বাকি অংশ আসল কমায়:
- প্রথম মাসের সুদ: 5,00,000 × 0.0075 = ৳3,750।
- প্রথম মাসে আসল শোধ: 10,379.18 − 3,750 = ৳6,629.18।
- বাকি থাকে: 5,00,000 − 6,629.18 = ৳4,93,370.82।
- দ্বিতীয় মাসের সুদ: 4,93,370.82 × 0.0075 ≈ ৳3,700.28, তাই আসলে যায় প্রায় ৳6,678.90।
কিস্তি একই থাকে, কিন্তু প্রতি মাসে সুদের অংশ একটু কমে আর আসলের অংশ বাড়ে। শেষ, অর্থাৎ 60তম কিস্তিতে সুদ মাত্র প্রায় ৳77.26। বছর ধরে যোগ করলে ছবিটা এমন:
| বছর | আসল শোধ (৳) | সুদ (৳) | বছর শেষে বাকি (৳) |
|---|---|---|---|
| 1 | 82,915 | 41,635 | 4,17,085 |
| 2 | 90,693 | 33,857 | 3,26,392 |
| 3 | 99,201 | 25,349 | 2,27,191 |
| 4 | 1,08,506 | 16,044 | 1,18,685 |
| 5 | 1,18,685 | 5,865 | 0 |
প্রতিটি ঘর নিকটতম টাকায় রাউন্ড করা, তাই সুদের ঘরগুলো যোগ করলে ৳1,22,750 আসে, মোট সুদের চেয়ে ৳1 কম। প্রথম বছরে কিস্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি যায় সুদে, শেষ বছরে 5%-এরও কম।
ফ্ল্যাট রেট বনাম রিডিউসিং ব্যালান্স
ফ্ল্যাট রেটে সুদ ধরা হয় পুরো মেয়াদ জুড়ে মূল লোনের ওপর, যত টাকাই শোধ করুন না কেন। তারপর আসল আর মোট সুদ যোগ করে কিস্তির সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা হয়। রিডিউসিং ব্যালান্সে সুদ ধরা হয় শুধু বাকি টাকার ওপর। তাই কাগজে একই শতাংশ লেখা থাকলেও ফ্ল্যাট রেটে মোট খরচ অনেক বেশি পড়ে।
শুধু বোঝার জন্য একটি তুলনা (কোনো নির্দিষ্ট ঋণদাতার শর্ত নয়): ওপরের একই ৳5,00,000, 9%, 5 বছর। ফ্ল্যাট হিসাবে সুদ = 5,00,000 × 9% × 5 = ৳2,25,000, আর কিস্তি = (5,00,000 + 2,25,000) ÷ 60 ≈ ৳12,083.33।
| 9%, 5 বছর | রিডিউসিং ব্যালান্স | ফ্ল্যাট রেট |
|---|---|---|
| মাসিক কিস্তি | ৳10,379 | ৳12,083 |
| মোট সুদ | ৳1,22,751 | ৳2,25,000 |
| মোট পরিশোধ | ৳6,22,751 | ৳7,25,000 |
একই “9%” ফ্ল্যাট রেটে প্রায় ৳1,02,249 বেশি সুদ। রিডিউসিং-ব্যালান্সে মাসে ৳12,083 কিস্তি হতে হলে হার লাগত বছরে প্রায় 15.7%। তাই অফার তুলনা করার সময় শুধু শতাংশ নয়, কোন পদ্ধতি আর মোট কত দিতে হবে, তা জেনে নিন।
ধাপে ধাপে নিজের ইএমআই হিসাব
- লোন অফার থেকে লোনের পরিমাণ (P), সুদের হার আর মেয়াদ নিন।
- হার বছরে দেওয়া থাকলে 12 আর 100 দিয়ে ভাগ করে r বের করুন; মাসে দেওয়া থাকলে শুধু 100 দিয়ে ভাগ করুন।
- মেয়াদকে মাসে বদলান: n = বছর × 12।
- (1 + r)ⁿ বের করুন, তারপর সূত্রে বসিয়ে ইএমআই হিসাব করুন।
- মোট পরিশোধ = ইএমআই × n, আর মোট সুদ = মোট পরিশোধ − P।
- যেকোনো মাসের সুদ = তখনকার বকেয়া × r; ইএমআই থেকে তা বাদ দিলে সেই মাসের আসল শোধ।
মেয়াদ বদলালে কী হয়, তাও একই সূত্রে দেখা যায়। ওপরের লোন 3 বছরে নিলে কিস্তি প্রায় ৳15,900 আর মোট সুদ প্রায় ৳72,395; 7 বছরে নিলে কিস্তি প্রায় ৳8,045 কিন্তু মোট সুদ প্রায় ৳1,75,741। মেয়াদ বাড়লে কিস্তি কমে, মোট সুদ বাড়ে।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- ফ্ল্যাট আর রিডিউসিং রেট গুলিয়ে ফেলা। “9% সুদ” দুই পদ্ধতিতে দুই রকম খরচ বোঝায়, ওপরের তুলনার মতো।
- বছরের আর মাসের হার মিশিয়ে ফেলা। বছরে 9% মানে মাসে 0.75%। মাসে 1% লেখা থাকলে সেটা বছরে 12%-এর সমান, বছরে 1% নয়।
- ঘোষিত হারকে কার্যকর বার্ষিক হার ভাবা। বছরে 9% মাসে মাসে চক্রবৃদ্ধি হলে কার্যকর হার দাঁড়ায় প্রায় 9.38%।
- ফি আর বিমা ভুলে যাওয়া। প্রসেসিং ফি, বিমা বা অন্য চার্জ ইএমআই সূত্রে নেই। লোনের আসল খরচ জানতে এগুলো আলাদা করে যোগ করুন, আর ঋণদাতার কাছে মোট পরিশোধের অঙ্ক চেয়ে নিন।
- ব্যাংকের শিডিউল হুবহু মিলবে ভাবা। ঋণদাতার আসল শিডিউল কিস্তি রাউন্ড করা, দিন গোনার পদ্ধতি, প্রথম কিস্তির তারিখ বা পরিবর্তনশীল হারের কারণে কিছুটা আলাদা হতে পারে।
- শুধু কিস্তির অঙ্ক দেখা। কিস্তি আপনার হাতে পাওয়া বেতন থেকেই যাবে। আগে বেতন ক্যালকুলেটরে নিট বেতন দেখে নিন, তারপর ভাবুন কত কিস্তি স্বচ্ছন্দে দিতে পারবেন।
হাতে হিসাব না করে আপনার লোনের পরিমাণ, হার আর মেয়াদ ইএমআই / লোন ক্যালকুলেটরে দিন: মাসিক কিস্তি, মোট সুদ, মোট পরিশোধ আর বছরভিত্তিক আসল-সুদের ভাগ একসঙ্গে দেখা যাবে। চূড়ান্ত অঙ্কের জন্য সবসময় আপনার লোন চুক্তি দেখুন।